দেশের বাইরে থেকে ডিভোর্সের নিয়ম

বাংলাদেশে ডিভোর্সের আইন ও প্রবাস থেকে ডিভোর্সের সঠিক নিয়ম

বিবাহ মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন। একটি পরিবার শুধু দুই জন মানুষের সম্পর্ক নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, সামাজিক স্থিতি এবং মানসিক শান্তির সাথেও জড়িত। তাই সমস্যা যত বড়ই হোক ডিভোর্সকে কখনোই প্রথম সমাধান হিসাবে বিবেচনা করবেন না।

ইসলামে তালাক বৈধ হলেও এটিকে অত্যন্ত অপছন্দনীয় বলা হয়েছে। একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, “হালাল জিনিসগুলোর মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় হলো তালাক।” এছাড়া হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে — “তোমরা বিবাহ করো, তালাক দিয়ো না; কারণ তালাকে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে।”

সামাজিক, মানবিক, রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় সব দৃষ্টিকোণ থেকেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা উচিত। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অধিকাংশ ডিভোর্স হয় সাময়িক রাগ, ভুল বোঝাবুঝি বা ইগোর কারণে। কিছুদিন পর অনেকেই নিজের ভুল বুঝতে পারেন, কিন্তু তখন আর ফিরে আসার সুযোগ থাকে না। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মে তালাক কার্যকর হয়ে গেলে, ফিরে আসার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যায়।

তালাকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে করণীয়

  • প্রথমে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন।
  • সমস্যা সমাধান না হলে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তির সাথে কথা বলেন, বন্ধু বান্ধবের সাথে শেয়ার করা উচিৎ নয়।
  • প্রয়োজনে কাপল কাউন্সেলিং বা পারিবারিক মধ্যস্থতার সাহায্য নেন।
  • এরপর উভয় পরিবারের অভিভাবক বা মান্যগণ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন।
  • সর্বোপরি, একে অপরকে সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখেন।

সব কিছু বিবেচনায়, যে কোন মূল্যে সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত।

বাংলাদেশে ডিভোর্সের আইনসম্মত প্রক্রিয়া

প্রবাস থেকে ডিভোর্স সম্পর্কে জানার আগে বাংলাদেশের ডিভর্স আইন সম্পর্কে জানা দরকার। মুসলিমদের তালাক মূলত ৩ ভাবে হয়ে থাকে:

১. মিউচুয়াল ডিভোর্স (Mutual Divorce)

যেভাবে বিবাহের সময় উভয়ের সম্মতিতে এবং সাক্ষরের মাধ্যমে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল, ঠিক একইভাবে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে ডিভোর্স রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

২. স্বামী কর্তৃক তালাক

স্বামী যদি তালাক দিতে চান, তাহলে তিনি নির্ধারিত তালাক রেজিস্ট্রেশন বইতে সাক্ষর ও টিপসই দিয়ে তালাক রেজিস্ট্রেশন করবে।

৩. স্ত্রী কর্তৃক তালাক

স্ত্রী কাবিননামার ১৮নং কলামের ক্ষমাতাবলে তালাকে তোফিউজ গ্রহণ করতে পারে, এক্ষেত্রে নির্ধারিত তালাক রেজিস্ট্রেশন বইতে সাক্ষর ও টিপসই দিয়ে তালাক রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

তালাক নোটিশ পাঠানোর নিয়ম

স্বামী কর্তৃক এবং স্ত্রী কর্তৃক তালাকের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশনের পর রেজিস্ট্রেশন নম্বরসহ একটি নোটিশ ইস্যু করতে হয়। সেই নোটিশের কপি পাঠাতে হবে:

  • যাকে তালাক দেওয়া হচ্ছে তার ঠিকানায়
  • সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন / পৌরসভা / ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর

যদি দ্বিতীয় পক্ষ দেশের বাইরে থাকেন, তাহলে দেশের বাইরের ঠিকানাতেও একটি কপি পাঠানো উচিৎ।
নোটিশ অবশ্যই সরকারি ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠাতে হবে এবং ডাক রিসিট সংরক্ষণ করতে হবে। পরবর্তীতে আইনগত প্রয়োজনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৯০ দিনের সালিশি অপেক্ষার সময়

সিটি করপোরেশন বা চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার পর একটি সালিশি পরিষদ গঠন করবে এবং উভয় পক্ষকে সমঝোতার জন্য আহ্বান করবে।

যদি উভয় পক্ষ বা কোন পক্ষ উপস্থিত না হন, অথবা সমঝোতা না হয়, তাহলে ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তালাক কার্যকর হবে। এখানে মনে রাখার বিষয় হলো …
কোন শর্টকাট পদ্ধতিতে ৯০ দিনের সময় এড়ানো যায় না।

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান স্পেশাল ম্যারেজের ক্ষেত্রে

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টের অধীনে সরাসরি তালাক রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা নেই। এ ক্ষেত্রে আদালতে সিভিল মামলা করে আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে বিচ্ছেদ বা সেপারেশন সম্পন্ন করতে হয়।

অনেকে শর্টকাট পদ্ধতিতে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে স্ট্যাম্পে হলফনামা করে মনে করেন ডিভোর্স হয়ে গেছে। বাস্তবে এটি আইনসম্মত ডিভোর্স নয়।

স্ট্যাম্পে হলফনামা বা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ডিভোর্স হয় না।

দেশের বাইরে থেকে ডিভোর্স করার প্রক্রিয়া

এবার আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে,  কীভাবে প্রবাস থেকে ডিভোর্স ফাইল করা যায়।

বর্তমান আইন অনুযায়ী, প্রবাস থেকে ডিভোর্স কার্যক্রম পরিচালনার একমাত্র বৈধ উপায় হলো পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (Power of Attorney)

পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কী?

পাওয়ার অব অ্যাটর্নি এমন একটি আইনগত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে আপনি দেশের বাইরে থাকলেও বাংলাদেশে কাউকে আপনার প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করতে পারেন। তিনি আপনার হয়ে নির্দিষ্ট আইনগত কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন।

ডিভোর্সের জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করার নিয়ম

আপনি যাকে পাওয়ার দিতে চান, তার: এনআইডি কার্ডের কপি এবং আপনার কাবিননামার কপি প্রয়োজন হবে।

এরপর বাংলাদেশে নিয়গ করা আপনার আইনজীবী পাওয়ার অব অ্যাটর্নির প্রস্তুত করে আপনাকে পাঠাবেন। আপনি যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই দেশের বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে হাইকমিশন কর্মকর্তার সামনে কাগজে সাক্ষর করবেন। এরপর হাইকমিশন থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি অ্যাটেস্টেড করতে হবে।

এই “হাইকমিশন অ্যাটেস্টেশন” বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ , কারণ পরবর্তী পুরো প্রক্রিয়া এটিই নির্ধারণ করে।

এরপর কাগজটি বাংলাদেশে পাঠাতে হবে। বাংলাদেশে সেটি আইন মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অ্যাটেস্টেড করার পর আপনার প্রতিনিধি আপনার পক্ষে তালাক রেজিস্ট্রেশন বইতে সাক্ষর করে তালাক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন।

এরপর নোটিশ পাঠাতে হবে এবং ৯০ দিনের আইনি সময় গণনা শুরু হবে এবং বাংলাদেশে সাধারণ তালাক যেভাবে কার্যকর হয়, ঠিক সেভাবেই কার্যকর হবে।

পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কাজ করে না

খুব দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে বাংলাদেশ হাইকমিশন  বলে দেয় যে তারা বা পারিবারিক বিষয় হ্যান্ডেল করে না ।

এখানেই মূল সমস্যার সৃষ্টি হয়। কারণ হাইকমিশন যদি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি অ্যাটেস্ট না করে, তাহলে আইনগতভাবে সেই পাওয়ার ব্যবহার করে সামনে এগোনোর সুযোগ থাকে না। সুতারাং পাওয়ার অব অ্যাটর্নির আলোচনা এখানেই শেষ। প্রবাস থেকে ডিভোর্স দেওয়া যায় না।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

অনেকে এমন পরিস্থিতিতে পরামর্শ দেয়

  • সিগনেচার করে পাঠিয়ে দিন, আমরা স্কান করে ডিভোর্স করায় দেবে হাইকমিশন অ্যাটেস্ট লাগবে না।
  • বাংলাদেশ থেকে কাগজ রেডি করে পাঠায় দেবে আপনি সিগনেচের করে আবার বাংলাদেশে পাঠায় দেবেন, আমরা ডিভোর্স কার্যকর করে নেবো।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

বাংলাদেশে মুসলিমদের তালাক ১৯৬১ সালের আইন অনুযায়ী সম্পন্ন হয় এবং ১৯৭৪ সালের আইনে তালাক রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে:

  • রেজিস্ট্রেশন বইতে সরাসরি সাক্ষর ও টিপসই থাকতে হবে
  • রেজিস্ট্রেশন বই কখনো দেশের বাইরে পাঠানো যায় না
  • সিগনেচারের সময় ইমিগ্রেশন তথ্য অনুযায়ী আপনাকে দেশে থাকা লাগবে।

তাই শর্টকাট বা অনিয়মিত পদ্ধতি ভবিষ্যতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।

তাহলে প্রাবাসীদের তালাকের উপায় কী?

আমরা বুঝি, বিদেশে থাকা মানুষদের পড়াশোনা, ব্যবসা, চাকরি বা অন্যান্য ব্যস্ততা থাকে, দীর্ঘ সময় দেশে থাকা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে আমরা আপনার সময় বাঁচাতে সহায়তা করতে পারি। দেশে আসার আগে আমাদের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন: ম্যারেজ সার্টিফিকেট / কাবিননামা পাঠিয়ে দিতে পারেন।

আমরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখবো। আপনি দেশে এসে ২০–৩০ মিনিটের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন বইতে সাক্ষর ও টিপসই সহ প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করে  আবার আপনার কাজে ফিরে যেতে পারবেন।

ইমিগ্রেশনের এরাইভাল সিলের কপি সংরক্ষণ করা হয়, যা ভবিষ্যতে যেকোনো অথরিটি বা এম্বাসি ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

ডিভোর্স সার্টিফিকেট সংগ্রহ

৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ডিভোর্স সার্টিফিকেট ইস্যু করা সম্ভব হবে। সে সময় আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকতে হবে না। আপনার পক্ষ থেকে অন্য কেউ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে পারবেন।

শেষ কথা

ডিভোর্স একটি আইনগত প্রক্রিয়া হলেও এর প্রভাব শুধুমাত্র কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি মানুষ, পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই সম্পর্ক রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন। আর যদি আইনগতভাবে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতেই হয়, তাহলে অবশ্যই সঠিক ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন। যোগাযোগঃ 01515-615786 WhatsApp Available

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *